ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০১৯ || ৩ শ্রাবণ ১৪২৬
bbp24 :: বরেন্দ্র প্রতিদিন
৩০১

বরাদ্দ হয় ফল ফলেনা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ৯ জুন ২০১৪  


মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান কৃষকরা যা খেয়ে বেঁচে থাকে গোটা দেশ। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও বাজেটে তাদের জন্য রাখা হয়নি প্রত্যাশিত বরাদ্দ। তাই বাধ্য হয়েই পেশা বদলাচ্ছেন অনেকে। 

 
বাজেট এলেই যেন তীর্থের কাকের মতো সবাই চেয়ে থাকেন অর্থমন্ত্রীর মুখপানে। অপেক্ষা করতে থাকেন প্রত্যাশা পূরণের। বাজেট ঘোষণা হলে যথারীতি কারো আশা পূরণ হয়, কারো আবার হয় না। ঠিক তেমনই ভাবে এবারও মাথার ঘাম মুছতে মুছতে অর্থমন্ত্রীর মুখপানে চেয়ে ছিলেন কৃষকরা। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর কৃষিখাতে বরাদ্দের পরিমাণ শুনে চরম হতাশ হয়েছেন তারা।
 
এদিকে প্রত্যাশিত বাজেট না পাওয়ায় ইতিমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন কৃষক নেতারা। কেউ বলছেন সেমিনারে, কেউ আবার মাঠ থেকে ফসল কেটে বাড়ি ফেরার পথে। মূলত দশম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করার পর থেকেই শুরু হয়েছে কৃষকদের ক্ষোভ প্রকাশ।
 
কৃষকদের মতে, যেহেতু কৃষি বাংলাদেশের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম, তাই এই খাতটির দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ এখনো অন্তত ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতটিতে বরাদ্দের পরিমাণ আরো বাড়ানো দরকার।
 
রোববার বিকেলে কথা হয় ঝিনাইদহ থেকে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকায় আসা এক কৃষকের সঙ্গে। নাম তার রইচ উদ্দিন। তিনি মূলত বোরো ও আমন ধানের চাষ করেন। তবে ফাঁকে ফাঁকে সবজি চাষ করেও বাড়তি কিছু উপার্জন হয় তার। দীর্ঘ দু’ ঘণ্টার আলাপচারিতায় কৃষক রইচ উদ্দিন জানান, সরকারের চাল কেনার সিদ্ধান্তে খুশি হওয়া তো দূরের কথা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। শুধু তিনিই নন, তার মতো কয়েক লাখ কৃষক সরকারের এমন সিদ্ধান্তে পড়েছেন চরম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। অনেকেই এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে বদলে ফেলছেন কৃষি পেশা। 
 
রইচ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাই, অথচ আমাগো নিয়া তো সরকারের কোনো মাথাব্যথা নাই। থাকলে তো আমাগো লাইগ্যা বাজেটে বরাদ্দ থাকতো, শ্রাদ্ধ না।’
 
তিনি আরো বলেন, ‘এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার পরও আমরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি না। আর এই না পাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ সরকারের ধান কেনার পদ্ধতি। আমাদের তো আর চাতাল নাই যে আমরা ধান কাইটা চাতালে দিয়া চাল বানাইয়া দিব। আমাদের এই দুর্বলতার সুযোগকে পুঁজি করে চাতাল ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
 
উল্লেখ্য, এবার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার বদলে চাতাল মালিক বা মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের কাছ থেকে চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে কৃষকরা কম দামে ধান বেচতে বাধ্য হচ্ছে।
 
রইচ উদ্দিনের ক্ষোভের কথাগুলো শুনছিলেন তার পশেই দাঁড়ানো আরেক কৃষক শমসের। তিনি দিনাজপুর থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের এভাবে অবহেলা করতে থাকে, তাহলে আর এদেশে কৃষি কাজ থাকবে না। ইতিমধ্যেই অনেকেই কৃষি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তার ওপর এবার বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ এতো কম। তাহলে কীভাগে উন্নতি হবে কৃষকদের ভাগ্যের।’
 
কৃষকদের এমন হতাশা বিষয় নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবার যেখানে আড়াই হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে কৃষিখাতের বরাদ্দ মাত্র সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে কৃষি খাতের এক ভাগ সমস্যারও সমাধান সম্ভব না।’
 
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সুকান্ত সফির সঙ্গে কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘কৃষকদের এখন প্রধান সমস্যা উৎপাদিত ফসল বিক্রি ও তার ন্যায্য মূল্য পাওয়া। কারণ তারা সাড়া বছর খেটে ফসল ফলান কিন্তু বিক্রির সময় দাম পান না। দাম পান আড়ৎদাররা।’
 
এমন সমস্যা কেন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূলত এখনো আমাদের দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো ফসল ক্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। তাই কৃষককে বাধ্য হয়ে কষ্টার্জিত ফসল নিয়ে আড়ৎদারের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হয়। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, এবার বাজেটে কৃষিখাতের উন্নয়নে যথেষ্ট বরাদ্দ রাখা হবে। যা দিয়ে পরবর্তীতে দেশের সকল ইউনিয়ন পর্যায়ে ফসল ক্রয়কেন্দ্র ও হিমাগাড় স্থাপন করা যেত।’
 
বাজেট নিয়ে কৃষকদের অসন্তুষ্টির কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। আবার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের মোট আকার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকায়। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমে হয় ১২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। 
 
এই ধারাবাহিকতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা যা জাতীয় বাজেটের মাত্র ৪ দশমকি ৯৫ শতাংশ। 
 
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি থাকছে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫ শতাংশ।
মেঘ

এই বিভাগের আরো খবর