ঢাকা, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ || ৫ পৌষ ১৪২৫
bbp24 :: বরেন্দ্র প্রতিদিন
২৪

নারী আন্দোলন বিষয়ক

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৮  


কথা বুঝেছিলেন বেগম রোকেয়া। বলেছিলেন, ‘আমরা সমাজেরই অর্ধাঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে, একই। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষও তাহাই। শিশুর জন্য পিতামাতাÑ উভয়েরই সমান দরকার।’ বুঝেছিলেন মেরি ওলস্টোন ক্রাফট। ফরাসী বিপ্লবের আবহে যিনি বেড়ে উঠেছিলেন। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী ধারণ করে লিখেছিলেন বিখ্যাত দুই বইÑ ‘দি ভিন্ডিকেশন অব দি রাইটস অব উইমেন’ এবং ‘দি রংগস অব উইমেন।’ তিনি বলেছিলেন, নারীর অধিকার স্বীকৃত হলেও তা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা কঠিন। সেই আঠারো শতকে তিনি যা উপলব্ধি করেছিলেন আজ এত বছর পরও তা সমান প্রযোজ্য। আরও বলেছিলেন, ‘নারীর প্রতি প্রত্যক্ষ অপমান ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ, কিন্তু নানাবিধ বিশেষণে গালভরা প্রশংসা করে তাকে যে অন্তপুরে রুদ্ধ করে রাখা হয় তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা খুবই কঠিন।’ ১৭৮৯ সালের সেই বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন দিগন্তরেখা স্পষ্ট করে। বিপ্লবের প্রভাবে ফরাসী চিন্তাবিদদের মনে নতুন ভাবধারা জন্ম নেয়। যার প্রভাবে সমাজে আলোড়ন তোলার পাশাপাশি নারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ফরাসী নারীদের অগ্রগামী একটি দল ‘নারী ও পুরুষের সমান অধিকার’ পুনর্প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘শ্রম ও কাজের অধিকারের জন্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মে নিয়োগের জন্য’ শিরোনামে একটি স্মারকলিপি ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদে পেশ করে। তাদের বক্তব্য ছিল, নারীদের যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ওঠার অধিকার থাকে তাহলে মঞ্চে ওঠার অধিকারও আছে। অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত নারীরা শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনেন। তারা বললেন, পরিবারে নারীর ভূমিকা ও মর্যাদা নির্দিষ্ট হতে হবে, সম্পত্তিতে অধিকার দিতে হবে এবং নারীর নিজের রোজগারের ওপর তার অধিকার আইনত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব দাবি জানাতে গিয়ে একসময় ভোটাধিকারের দাবি সামনে এসে পড়ে। ভোটাধিকারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন মূলত সম্পদশালী নারীরা। শ্রমিক নারীদের এতে সমর্থন ছিল। ধনী নারী আর শ্রমিক নারীদের স্বার্থ ছিল আলাদা। তাদের দাবি-দাওয়াগুলো সমান্তরালে আবর্তিত হয়নি কখনও। তাদের জীবনধারাই পরস্পরবিরোধী। আজও আমাদের এ ছোট দেশেও মধ্যবিত্ত নারীদের আন্দোলন পোশাক কারখানার শ্রমিক নারীদের আন্দোলন থেকে মৌলিক পার্থক্য বজায় রেখে চলছে। কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধের জন্য যখন হাইকোর্ট রুল জারি করে পোশাক কারখানার হাজার হাজার নারী শ্রমিকের কাছে তখন এই নিপীড়নের চেয়ে বেশি জরুরী হয়ে ওঠে মাস শেষে নির্দিষ্ট সময়ে মজুরি পাওয়া ও ন্যায্য মজুরির বিষয়টি। সর্বজনীন ভোটাধিকার পেতে পুরুষদেরও সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৮৬৭ সালের আগে সম্পদশালী উচ্চ শিক্ষিত পুরুষরাই শুধু ভোট দিতে পারতেন। নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন যখন চরম রূপ নিয়েছে তখন সরকার ও বিত্তবানদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পুরুষের মতো ধনী উচ্চ শিক্ষিত নারীদের ভোটাধিকারের বিষয়টিই কেবল বিবেচনা করা যেতে পারে। আসলে আঠারো শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত সময় ছিল অধিকার অর্জনের আন্দোলনে ঘটনাবহুল সময়। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে প্রগতিশীল নারী ফ্রন্টের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে জার্মান সমাজতন্ত্রী নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর দু’বছর আগে ৮ মার্চ শিকাগো শহরের শ্রমিক নারীরা আট ঘণ্টা কর্ম সময়ের দাবিতে আন্দোলন করলে পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তাতে বেশ ক’জন নারী শ্রমিক নিহত হন। সেই শ্রমিক নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দিনটি রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে পালন করা হতো। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে অনুমোদন দেয়। জাতিসংঘ অনুমোদন দেয়ায় তার নিজেরও কিছু দায়বদ্ধতা এসে যায়। ঘোষিত হয় নারী দশক, রচিত হয় সিডও সনদ, অনুষ্ঠিত হয় নারী সম্মেলন। সবই আন্তর্জাতিক পরিম-লে। জাতীয় পর্যায়েও কাজ হয় কিছু কিছু। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ হৈমন্তী গল্পে লিখেছেন, ‘কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন, মেয়েটির বিয়ের বয়স পার হইয়া গেছে, কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোন রকমে চাপা দেয়ার সময়টাও পার হইয়া যাইবে। মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে, কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনও তাহার চেয়ে কিঞ্চিত উপরে আছে, সেই জন্যই তাড়া।’ শিক্ষায় যোগ্যতায় সমান পারদর্শী মেয়ের বাবা বিয়েতে মেয়েকে সাজানোর জন্য এক সেট গয়না আর যে ঘরে সে যাবে সে ঘর সাজাতে এক সেট ফার্নিচার দেবেনই। ‘যৌতুক’ নয়, মেয়েকে বাবার দেয়া ‘উপহার।’ শোপেন হাওয়ার বলেছেন, ‘সন্তানের জন্ম দিয়ে, সন্তান পালন করে ও স্বামীদের অধীনে থেকেই নারীরা তাদের জীবনের ঋণ পরিশোধ করবে। তাদের ইচ্ছামতো মত প্রকাশ করতে দেয়া যায় না।’ এক-দু’শ’ বছর পর আজও কি বাতাসে দার্শনিক শোপেন হাওয়ারের সেই কথা প্রতিধ্বনি তোলে না? দায়ী কে? ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নাকি পদ্ধতি। সিস্টেম তৈরি করে ব্যক্তিকে, আবার ব্যক্তি প্রভাবিত করে সিস্টেমকে। যারা ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদের কথা বলেছিলেন অবস্থার দুর্বিপাকে আজ তাদের কণ্ঠ ক্ষীণ। তবে তারা নারীর কাজকে গৃহের চৌহদ্দি থেকে বের করে সামাজিক শ্রমের মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে কথা ভোলা যায় না। শোপেন হাওয়ারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে যারা বলেছিল, নারী বাইরের কাজে গেলে সংসার জীবনে সঙ্কট তৈরি হয়, তাই তাদের ঘরেই থাকা প্রয়োজন, ঘরকন্নাই নারীদের একমাত্র কাজ।’ তারা বিলুপ্ত প্রজাতির কাতারে নিজেদের নাম লেখায়নি। বরং শতগুণ বেড়ে অশরীরীর মতো বিচরণ করছে। তাহলে কি চলাতেই ভুল ছিল? দু’জন চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে একাকী পথ চলার আনন্দ খুঁজে নেয়া হয়েছিল? তাও তো নয়। পথের সঙ্গী হয়েছিলেন অনেকে সেই শুরু থেকে। অনেক বিরোধ থাকার পরও। আজও আছেন চলার সঙ্গী। নইলে একটুও এগোনো সম্ভব হতো না। যেটুকু অর্জন তা যৌথ চলারই ফল। নারী এবং পুরুষ দু’জনার যৌথ চলাই কেবল এগিয়ে নেবে সামনে এক শ’ বছর দু’শ’ বছর হাজার বছর। এর কোন বিকল্প নেই।