ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০১৯ || ৩ শ্রাবণ ১৪২৬
bbp24 :: বরেন্দ্র প্রতিদিন
২৫৩

জনশক্তি রফতানিতে প্রয়োজন নিরাপত্তা

প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫  


দেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজন মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, দক্ষ-অদক্ষ মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে বাড়েনি কর্মসংস্থান। তবে বিদেশে শ্রমশক্তি রফতানির মাধ্যমে এই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া সম্ভব ।

 

কিন্তু এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে, শ্রমশক্তি রফতানি প্রক্রিয়ায় মজুরি যেন সস্তা না হয় এবং একইসঙ্গে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আর শ্রমশক্তি রফতানির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা আমাদেরকে এ দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই কাজে লাগাতে হবে।

 

জনশক্তি রফতানিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে পুরনো ও বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব। যা ২০০৮ সাল থেকে বন্ধ ছিল। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে অবশেষে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে তেলসমৃদ্ধ দেশটি। নতুন করে এই শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার বিষয়টি দেশের জনশক্তির জন্য সুখবর।

 

এখন বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে গৃহকর্মী খাতের ১০ শ্রেণিতে প্রায় ১০ হাজার কর্মী নিতে রাজি হয়েছে সৌদি আরব। শুরুতে কর্মীদের বেতন ১২০০ থেকে ১৫০০ রিয়ালের মধ্যে (২৪ হাজার থেকে ৩১ হাজার টাকা) হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা ৮০০ রিয়ালেই (১৬ হাজার ৮০০ টাকা) চুক্তি হয়। এছাড়া থাকা-খাওয়া ও অন্য সব সুযোগ-সুবিধা পাবে কর্মীরা। দেশটিতে যেতে কর্মীপ্রতি খরচ হবে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। এসব কর্মী বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারকদের মাধ্যমে নেওয়া হলেও এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের হাতে।

 

এখন প্রশ্ন ওঠেছে, এত কম বেতনে গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি কি ঠিক হলো? এর জবাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১২০০ থেকে ১৫০০ রিয়ালের মধ্যে কর্মী নিতে সৌদি আরব রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষিতে ৮০০ রিয়ালেই চুক্তি করতে হয়েছে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, দীর্ঘদিন পর যেহেতু দেশটিতে শ্রমবাজার খুলছে তাই এ প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

 

এদিকে দেশটিতে নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো। তারা বলছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীরা প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এ কারণে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ সৌদি আরবে নারী কর্মী রফতানি কমিয়ে এনেছে।

 

তাই দেশটিতে নারী কর্মী পাঠানো হলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মাসে অন্তত একবার দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাদের খোঁজ খবর নিতে হবে। আর এসব তদারকির জন্য প্রয়োজনে দূতাবাসে লোকবল বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা নিতে হবে।

 

এর আগে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে (জিটুজি) কর্মী পাঠানো শুরু হলেও খুব বেশি কর্মী সেখানে যেতে পারেননি। ২০১৩ সালে যেখানে কমপক্ষে দুই লাখ লোক পাঠানোর কথা সেখানে মাত্র চার হাজারের মত লোক পাঠানো হয়েছে।

 

এদিকে প্রায় আট বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য চালু হতে যাচ্ছে কুয়েতের শ্রমবাজার। বর্তমানে কুয়েতে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন।

 

জনশক্তি, কর্মসংস্থাণ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থাণের সুযোগ হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ৬৬ হাজার ৬ জন কর্মী রফতানি হয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে সরকারি হিসাবে ১২ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত। ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোট ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৩২ জন কর্মী রপ্তানি হয়। আর কুয়েতে গত পাঁচ বছরে রপ্তানি হয় মাত্র ২ হাজার ১৪৬ জন। ওমানে গত পাঁচ বছরে মোট কর্মী রপ্তানি হয়েছে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৪৮২ জন। একই সময়ে কাতারে মোট কর্মী রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৭ জন। বাহরাইনে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৭ জন কর্মী রপ্তানি হয়েছে। লেবাননে রফতানি হয়েছে মোট ৬৯ হাজার ৩৩৪ জন কর্মী। জর্ডানে রপ্তানি হয়েছে মোট ৫৬ হাজার ৯৭৮ জন।

 

অর্থনৈতিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবসহ নানা কারণে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। এ সময় ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রতারকদের পাল্লায় পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে লাখো মানুষ। নৌপথে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় ঝরে গেছে হাজারো প্রাণ। গহীন বনে বন্দি অবস্থায় দিন গুণছে হাজারো শ্রমিক। বিদেশে কারাগারে রয়েছে অনেকেই।

 

এখন সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বিদেশ গমনেচ্ছুদের স্বপ্ন পূরণের যে সুযোগ তৈরি হলো, তা যেন কোনভাবেই অসাধু চক্রের কারণে ভেস্তে না যায়। দালাল ও প্রতারকদের হাতে আর কেউ যেন তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নি:স্ব না হয়, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজর রাখতে হবে। একইসঙ্গে এ কর্মযজ্ঞের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। এছাড়া বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ সমৃদ্ধ করে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের দূরত্ব থাকলে তার অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।